
শীতকাল শেষ হওয়ার আগেই রাজশাহী অঞ্চলের আমবাগানগুলোতে আগাম মুকুল দেখা দিয়েছে। ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেই পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে আমের মুকুল। এতে এবারের আম মৌসুম ঘিরে চাষিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে একই সঙ্গে কুয়াশা ও রোগবালাই নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। মুকুল রক্ষায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন আমচাষিরা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে আমের আবাদ হয়েছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে। ওই বছর উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন আম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন।
সরেজমিনে পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা এবং নগরীর পদ্মা নদীর পাড়ঘেঁষা আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, দেশি জাতের পাশাপাশি বারী-৪, বারী-১১, আম্রপালি, আশ্বিনা ও ল্যাংড়া জাতের গাছে আগাম মুকুল আসতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও বাগানের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ গাছে মুকুল দেখা গেছে। যদিও পুরো বাগান এখনো মুকুলে ভরে ওঠেনি, তবুও আগাম মুকুলকে ভালো ফলনের ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘন কুয়াশা ও শীতের কারণে মুকুলে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাগানে সময় দিচ্ছেন চাষিরা। কেউ গাছের গোড়ায় সেচ দিচ্ছেন। কেউ সার প্রয়োগ করছেন। আবার কেউ কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করছেন। অনেক বাগানে আগাছা পরিষ্কার এবং মাটি আলগা করার কাজও চলছে।
পবা উপজেলার আমচাষি শাহরিয়ার সায়েম বলেন, ‘গত মৌসুমে মুকুল এলেও কুয়াশা ও রোগবালাইয়ের কারণে অনেকটাই ঝরে গিয়েছিল। তাই এবার আগেভাগেই পরিচর্যা শুরু করেছি। সময়মতো সেচ ও স্প্রে করলে মুকুল শক্ত হবে এবং ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।’ চাষি রবিউল ইসলাম রবি বলেন, ‘এবার শীত ও কুয়াশা তুলনামূলক বেশি। তবে এখনো আবহাওয়া আমের অনুকূলে রয়েছে। গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আমরা বেশি সতর্ক।’
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগাম মুকুল আসা শুরু করতেই মৌসুমি বাগান ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা মাঠে নামতে শুরু করেছেন। তারা মুকুল দেখে বাগান কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে আবহাওয়া পুরোপুরি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত বাগান কেনাবেচা এখনো জমে ওঠেনি। রাজশাহী আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগাম মুকুল ভালো লক্ষণ। তবে কুয়াশা ও ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। শেষ পর্যন্ত সবকিছুই আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করবে।’
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে যে মুকুল দেখা যাচ্ছে তা প্রাথমিক পর্যায়ের। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে পরিপূর্ণ মুকুল আসবে। এখন থেকেই সঠিক পরিচর্যা ও রোগবালাই দমন করা গেলে ফলন ভালো হবে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে রয়েছে।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘একটি আমগাছে বছরে অন্তত দুইবার কীটনাশক প্রয়োগ জরুরি। গত বছর হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৭ টন। চলতি বছর তা বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৮ টন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’