
প্রবাদ আছে—স্বামী যাকে দেখতে পারেন না, ‘রাখালেও তাকে ঢিল মারে’। সেই প্রবাদ যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে ৫৫ বছর বয়সী তাসলিমা বেগমের জীবনে। ৩৯ বছরের দাম্পত্য জীবনেও সুখ মেলেনি তাঁর। স্বামী ও দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে তিনি অসহায় অবস্থায় মেয়ের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
জানা গেছে, তাসলিমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছেন। অভিযোগ রয়েছে, অসুস্থ হওয়ার পর স্বামী ও ছেলেরা তাঁর যথাযথ দেখভাল করেননি। বড় মেয়ে মারহুমা ফেদৌস শিল্পী খাতুন নিজেও স্বামী পরিত্যক্তা। দুই মেয়েকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করলেও মায়ের অসহায়ত্ব দেখে তাঁকে নিজের কাছে এনে সেবা-শুশ্রূষা করছেন।
শুক্রবার (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বাঘা পৌরসভার বাজুবাঘা গ্রামে শিল্পী খাতুনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তাসলিমা বেগম মেঝেতে শুয়ে আছেন, নড়াচড়া করতে পারছেন না। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকায় তাঁর শরীরে পক্ষাঘাত (চিকিৎসকের ভাষায় স্ট্রোকজনিত সমস্যা) দেখা দিয়েছে। আশপাশে মশা-মাছির উপদ্রবও লক্ষ্য করা যায়। কাছে গেলে তিনি অস্পষ্টভাবে কথা বলার চেষ্টা করেন।
শিল্পী খাতুন জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ দেখে আসছেন। তাঁর দাবি, অসুস্থ হওয়ার পরও মা যথাযথ চিকিৎসা পাননি; বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করতে হয়েছে এবং শরীরে ঘা হয়েছে। এ অবস্থায় চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি লালপুরের দুড়দুড়িয়া গ্রামের বাড়ি থেকে মাকে নিজের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন তিনি।
তিনি আরও জানান, মায়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। ১৪ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগে ছয় দিন ভর্তি রেখে চিকিৎসা করানো হয়। পরে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সাত দিন এবং থেরাপির জন্য রাজশাহীর একটি বেসরকারি সিআরপিতে নয় দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এর আগে স্থানীয় সমাজপতি ও রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে তাসলিমাকে তাঁর স্বামীর বাড়িতে ফেরানোর চেষ্টা করা হলেও তাতে সাড়া মেলেনি বলে জানান শিল্পী খাতুন। শেষ পর্যন্ত আইনি সহায়তা নিতে বাধ্য হন তিনি।
আইনগত সহায়তা চেয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নাটোর জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে শিল্পী খাতুন বাদী হয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আসামিরা হলেন—তাসলিমা বেগমের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক এবং দুই ছেলে আকাশ চৌধুরি সম্রাট ও মো. শিমুল। তাঁদের বাড়ি লালপুরের দুড়দুড়িয়া নতুনপাড়া এলাকায়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “দেখভাল করিনি—এটা ঠিক না। সাত বছর আগে স্ট্রোক হলে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। এবার টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি। বড় মেয়ে এসে নিয়ে গেছে।” একই বক্তব্য দিয়েছেন তাঁর দুই ছেলে।
এ বিষয়ে শাহদৌলা সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আব্দুল হানিফ মিয়া বলেন, সমাজে প্রবীণ ব্যক্তিদের মর্যাদা বৃদ্ধির কাজ প্রত্যাশিতভাবে এগোচ্ছে না। মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাঠামোগত সামাজিক নজরদারি বাড়িয়ে বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক ও সম্মানজনক ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি।