May 24, 2026, 5:09 pm
শিরোনাম :
রাজনৈতিক বিবেচনায় দুদকের মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ ঘিরে আলোচনা রাজশাহীতে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ১৪ রাজশাহীতে শিশুদের মৃত্যু নিয়ে স্বাস্থ্য সচিবের দুঃখ প্রকাশ ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকেই ফিরলেন তেল না পেয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসকের শ্রদ্ধা রাজশাহী প্রেসক্লাবে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শামসুল ও রেজাউলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হবেন না: খেলোয়াড়দের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আর্থিক নিরাপত্তা ও মুক্ত গণমাধ্যম নীতিমালা চান সাংবাদিকেরা: আরইউজে’র আলোচনা সভা জুলাইযোদ্ধা ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত, লাশের অপেক্ষায় মা দেশে মব কালচার আর থাকবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জুলাইযোদ্ধা ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত, লাশের অপেক্ষায় মা

ডেস্ক নিউজ :-

মৃত্যুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও ইয়াসিন শেখের লাশ ফিরে পায়নি পরিবার। গত বছরের ২৭ মার্চ এই জুলাইযোদ্ধা ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত হন। মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায় ১ এপ্রিল। সেই থেকে পুত্রের লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তার মা ফিরোজা বেগম।

নিহতের বড় ভাই মো. রুহুল আমিন শেখ জানান, রস্তভ-অন-ডন ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে ইয়াসিন মিয়া শেখের মৃতদেহ সুরক্ষিত রয়েছে। বিষয়টি অবগত করে দ্রুত লাশ আনার দাবিতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করা হয়। একের পর এক পত্রালাপ হলেও তার ভাইয়ের লাশ বা ক্ষতিপূরণ কিছুই এখনো পায়নি পরিবার।

নিহত ইয়াসিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুত্র ইয়াসিনকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করছেন না তার মা ফিরোজা বেগম। পুত্রশোকে শয্যাশায়ী হলেও বারবার ছেলের ছবিতে হাত বুলাচ্ছেন তিনি। বাড়ির পাশ দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজলেই ছুটে যান। ‘এই তো ইয়াসিন আসছে, ইয়াসিন আসছে’ বলে চিৎকার শুরু করেন। ছেলের লাশের অপেক্ষায় দিন কাটছে এই মায়ের। তিনি বলেন, “তোমরা আমার ছেলেকে এনে দাও। আমার সোনা মানিকের লাশটা স্পর্শ করে দেখি।”

তিনি আরও জানান, গত বছরের ২৬ মার্চ শেষ কথা হয়। “টাকা পাঠাবো, ঘর বানাবো”— আরও কত কথা বলেছিল আমার ছেলেটা। এটাই ছিল ওর সঙ্গে শেষ কথা। প্রায় এক বছর হয়ে গেল, আমার পুত্রের কোনো সন্ধান পেলাম না।

বাংলাদেশ দূতাবাস, মস্কো, রাশিয়া (শ্রম কল্যাণ উইং)-এর প্রথম সচিব (শ্রম) মো. মাজেদুর রহমান সরকার এক পত্রে জানান, কূটনৈতিক পত্র প্রেরণ, ইয়াসিন মিয়া শেখের মৃতদেহ চিহ্নিতকরণ, দূতাবাসকে অবহিতকরণ এবং দ্রুত দেশে প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রভাগের যোদ্ধা ছিলেন ইয়াসিন মিয়া শেখ। কলেজের ক্লাস ছেড়ে ৭ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’-এর কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। এ আন্দোলনে তার ছিল ধারাবাহিক দৈনিক অংশগ্রহণ। ‘শহিদ আবু সাঈদ’-এর অঙ্কিত ছবি এক হাতে এবং অন্য হাতে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে সগৌরবে ঘরে ফিরেছিলেন এই যোদ্ধা। শহিদদের স্মরণে ১০ আগস্ট মোমবাতি প্রজ্বলনের কর্মসূচিও পালন করেন।

ইয়াসিন শেখের ফেসবুক সূত্রে জানা যায়, ৮ জুলাই ‘মনে রেখো যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে দেশ পেয়েছি’ গানটি শেয়ারের মাধ্যমে আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন। ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজের মেসেঞ্জার গ্রুপে তথ্য দিয়ে লেখেন, তিন ছাত্রলীগ কর্মী নিহত— এ দিনের আন্দোলনের তথ্যও শেয়ার করেন। ৩১ জুলাই হাইকোর্টের সামনে শিক্ষার্থী ও আইনজীবীদের ধস্তাধস্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ঢাকার প্রায় প্রতিটি আন্দোলনেই সরব ছিলেন ইয়াসিন। ঢাকা থেকে ফিরে ময়মনসিংহের আন্দোলনেও অগ্রসৈনিক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। মিটিং-মিছিল ও প্রতিবাদে ছিলেন সম্মুখসারির এক যোদ্ধা।

১ আগস্ট রাত ৮টা ১৫ মিনিটে তিনি লেখেন, “আর ঘরে বসে থাকতে পারছি না, আমিও আসছি।” একই দিন বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে লিখেছিলেন, “উত্তাল ময়মনসিংহ টাউন হল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।” সঙ্গে ছিল আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি। ৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ৫৮ মিনিটে লিখেন, “এই দেশ আমাদের, কোনো মুজিব বাহিনীর না; সুতরাং আমাদেরকেই এই দেশ বাঁচাতে হবে”— এবং দেশবাসীকে আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

এক হাতে শহিদ আবু সাঈদের ছবি এবং অন্য হাতে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে ফেসবুকে লিখেন, “আলহামদুলিল্লাহ, জুলুম কখনো চিরস্থায়ী হয় না।”

৬ আগস্ট রাত ৮টা ৪৭ মিনিটে লিখেন, “অভিনন্দন নোবেলজয়ী ড. ইউনুস।” এরপর ৭ আগস্ট সকাল ৭টা ২ মিনিটে “দেশপ্রেমিকের রক্তই স্বাধীনতা বৃক্ষের বীজস্বরূপ” স্ট্যাটাস দেন ফেসবুকে।

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাকে যুদ্ধে যাওয়ার সাহস জোগায়। সেই সাহস এবং বাবার ইচ্ছা পূরণের জন্যই রাশিয়ায় গিয়ে সেখানে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ইয়াসিন। তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালী গ্রামের মৃত আব্দুস সাত্তার মীরের পুত্র। গত ২৭ মার্চ তিনি যুদ্ধে নিহত হন। এ খবর পরিবার জানতে পারে ১ এপ্রিল। তবে তার লাশের অবস্থান দীর্ঘদিন নিশ্চিত ছিল না।

উঁচু-লম্বা ও সুদর্শন ইয়াসিনের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া ছিল তার বাবার স্বপ্ন। ডৌহাখলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর দেশের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে একাধিকবার চেষ্টা করেও সফল হননি। ২০২১ সালে গৌরীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। পরে ঢাকার মিরপুরে বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজে বিবিএতে অধ্যয়নরত ছিলেন।

ইয়াসিন তার আইডিতে পোস্ট করা ভিডিও বার্তায় জানান, গত বছরের জানুয়ারিতে রাশিয়ার একটি কোম্পানিতে চাকরির জন্য আবেদন করেন। সেপ্টেম্বর মাসে অফার লেটার পেয়ে রাশিয়ায় যান। মস্কো থেকে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দূরের ওই কোম্পানিতে তিন মাস চাকরির পর অনলাইনে আবেদন করে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে যোগ দেন।

তিনি বলেন, দেশে না হলেও বিদেশে সৈনিক হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন। ওই ভিডিওতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিচারণ এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের জন্য দোয়া চান। যুদ্ধে মৃত্যু হলেও তার কোনো আফসোস থাকবে না বলেও জানান তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা