
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম বেগম খালেদা জিয়া। যিনি ছিলেন সংগ্রাম, ত্যাগ ও আপসহীনতার প্রতীক। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি ছিলেন একজন গৃহবধূ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজনীতির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপির নেতাকর্মীদের অনুরোধ ও চাপেই রাজনীতিতে নাম লেখান তিনি। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক পথচলা।
এরপর থেকেই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন খালেদা জিয়া। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক। দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার, কারাবাস—সবকিছু উপেক্ষা করে দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তিনি পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ নামে।
স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একসঙ্গে মাঠে নামে। সে সময় একাধিকবার কারাবরণ করতে হয় খালেদা জিয়াকে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থেকে তিনি রাতারাতি দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। নির্বাচন বর্জনের এই অবস্থানই তাকে সাধারণ মানুষের কাছে আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৯১ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করলেও জনমতের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বুঝে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে দ্বিধা করেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করে দেন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। তবে ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়। ২০০৭ সালে আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ সময় দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। নির্যাতন, কারাবাস ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও দেশ ছাড়েননি তিনি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন। হাজারো নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, গুম ও হত্যার শিকার হন। ২০১০ সালে সেনানিবাসের বাসভবন থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়। সেদিন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।”
২০১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন আয়োজন করলে বিএনপি তা বর্জন করে। একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে। এরপর ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরিত্যক্ত পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে একাকী বন্দিজীবন কাটাতে হয় তাকে। তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও চিকিৎসার সুযোগ সীমিত রাখা হয়।
২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও কার্যত গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে।
দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। তবে বয়সজনিত দুর্বলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে তার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যায়। সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর তাকে গুরুতর অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। অবশেষে রাজনীতির আপসহীন এই নেত্রী চিরবিদায় নেন।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আপসহীন অবস্থান, জেল-জুলুমের মুখেও মাথা নত না করা দৃঢ়তা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই—সব মিলিয়ে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।