
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে মাসব্যাপী ‘হলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্পেইন’ শুরু করতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। মেন্টাল হেলথ ক্লাব, রাজশাহী ইউনিভার্সিটি (MHCKU)-এর সহযোগিতায় এই ক্যাম্পেইনটি আয়োজন করা হচ্ছে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টায় রাকসুর কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান রাকসু নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রাকসুর মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হাফসা বলেন,”প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবাসিক ও অনাবাসিক সব শিক্ষার্থীই কোনো না কোনো হলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ক্যাম্পেইনটি হলভিত্তিকভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি জানান, ক্যাম্পেইনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হল ও ১টি ডরমেটরিসহ মোট ১৮টি পয়েন্টে পরিচালিত হবে, যা ৬টি ক্লাস্টারে ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হবে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত বছরের শেষ দিকে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে দুই শিক্ষার্থীকে।১২ নভেম্বর ২০২৫-এ শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানা এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতা আত্মহননের মাধ্যমে মারা যান। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের নাজুক মানসিক অবস্থার ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর ১০ থেকে ১১ হাজার মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেন। অন্যদিকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৯২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৯৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব ও ‘ট্রিটমেন্ট গ্যাপ’-এর কারণে অনেকেই বুঝতেই পারছেন না যে তাদের মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।
ক্যাম্পেইনটি দুটি ধাপে পরিচালিত হবে। প্রথম ধাপে নির্ধারিত বুথে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে দুই ধাপে মেন্টাল হেলথ চেক-আপ পরিচালনা করা হবে। এতে ডিপ্রেশন, এংজাইটি, স্ট্রেস, হোপলেসনেস, ইন্টারনেট অ্যাডিকশন এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে।
দ্বিতীয় ধাপে সংশ্লিষ্ট হলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হবে। এসব ওয়ার্কশপে মানসিক স্বাস্থ্য কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক সহায়তা কোথায় পাওয়া যায়, কীভাবে বন্ধু বা সহপাঠীদের মানসিকভাবে সহায়তা করা যায় এসব বিষয়ে সাইকো-এডুকেশন দেওয়া হবে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও ট্যাবু দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য চেক-আপ, নিজের মানসিক অবস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন, পেশাদার স্ক্রিনিং ও দিকনির্দেশনা, ইন্টারঅ্যাকটিভ ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ, সাপোর্ট সার্ভিস ও রেফারাল সংক্রান্ত তথ্য এবং একটি নিরাপদ, গোপনীয় ও বিচারহীন পরিবেশে নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর সদস্যরা জানান , এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসে একটি জাজমেন্ট-ফ্রি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে তাদের মানসিক কষ্টের কথা বলতে পারবে। সময়মতো সচেতনতা ও সঠিক ইন্টারভেনশন সোনিয়া বা লামিসার মতো আর কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া রোধ করতে পারে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।