রাজশাহীতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুইটি মামলা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক উল্লেখ করে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এসব মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ ঘিরে প্রশাসনিক ও আইনি অঙ্গনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা এ সুপারিশ বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের বাছাই কমিটির বিবেচনায় রয়েছে। তবে মামলার তদন্তকারী সংস্থা দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি এবং আনুষ্ঠানিকভাবেও কিছু জানানো হয়নি।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ১ জুন আরডিএর সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আমির হোসাইন। পরদিন একই অভিযোগে তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়, শেখ কামরুজ্জামান অবৈধ উপায়ে ১ কোটি ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৯১১ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। একইসঙ্গে তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে ৬৮ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, উভয়ের কর্মকাণ্ড দুর্নীতি দমন আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মামলাগুলো বিচারাধীন অবস্থায় ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান তারা। এ ঘটনার পর আরডিএ কর্তৃপক্ষ শেখ কামরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও পরবর্তীতে সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভিযুক্ত প্রকৌশলী বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেন। এরপরই তার বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহারের পাশাপাশি মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগও শুরু হয়।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়। আবেদনে শেখ কামরুজ্জামান নিজেকে জাতীয়তাবাদী প্রকৌশলী সংগঠন (অ্যাব)-এর নেতা এবং তার স্ত্রীকে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
জেলা পর্যায়ে গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে গত মার্চ মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে মামলা দুটি প্রত্যাহারের সুপারিশ পাঠায়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতারের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার এবং পাবলিক প্রসিকিউটর সদস্য হিসেবে ছিলেন।
রাজশাহীর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. রইসুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে মামলাগুলোকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনা করে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে দুদক। রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী বলেন, মামলাগুলো বর্তমানে বিচারাধীন এবং মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে দুদককে কিছু জানানো হয়নি। এমনকি তাদের মতামতও চাওয়া হয়নি।
এদিকে প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তাও এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিতে পারেননি। ফলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
সূত্র আরও জানায়, শেখ কামরুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার বারখাদা এলাকায়। তার স্ত্রী নিশাত তামান্না রাজশাহী মহানগরীর শাহ মখদুম থানার পবা নতুনপাড়ার বাসিন্দা এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য নূরুল ইসলামের মেয়ে।
এছাড়া আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, চাকরি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আরও একটি দুর্নীতির মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক সুপারিশের ভিত্তিতে দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নতুন করে বিচারিক স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে।