আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনের ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮৪ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্বাচনী ব্যয় করতে পারবেন। নির্ধারিত ব্যয়সীমা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে সংসদীয় আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় প্রার্থীরা ওই ভোটার তালিকার সিডিও পেয়েছেন। আইন অনুযায়ী, নির্বাচনী ব্যয় এই তালিকা অনুসারেই নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৪৪(খ) অনুচ্ছেদের দফা তিন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর মোট নির্বাচনী ব্যয়—তার দলীয় ব্যয়সহ—ভোটারপ্রতি ১০ টাকা অথবা ২৫ লাখ টাকার মধ্যে যেটি বেশি হবে, তার বেশি হতে পারবে না।
সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা গাজীপুর-২ আসনে
ভোটার তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে। এখানে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। সে হিসেবে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হারে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা দাঁড়ায় ৮৪ লাখ ৩ হাজার ৩৩০ টাকা।
ভোটারের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা-১৯ আসন। এখানে ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন ভোটার থাকায় ব্যয়সীমা নির্ধারিত হয়েছে ৭৪ লাখ ৭০ হাজার ৭০০ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা গাজীপুর-১ আসনে ৭ লাখ ২০ হাজার ৯৩৯ জন ভোটারের বিপরীতে ব্যয়সীমা ৭২ লাখ ৯ হাজার ৩৯০ টাকা। আর চতুর্থ অবস্থানে থাকা নোয়াখালী-৪ আসনে ব্যয়সীমা ৭০ লাখ ৩ হাজার ৩৯০ টাকা।
ভোটার সংখ্যার হিসাবে আট লাখের বেশি ভোটার রয়েছে কেবল গাজীপুর-২ আসনে। সাত লাখের বেশি ভোটার রয়েছে ঢাকা-১৯, গাজীপুর-১ ও নোয়াখালী-৪—এই তিনটি আসনে।
বিভিন্ন শ্রেণিতে আসন ও ব্যয়সীমা:
ছয় লাখের বেশি ভোটারের আসন
ছয় লাখের বেশি ভোটার রয়েছে এমন সাতটি আসনে প্রার্থীরা আসনভেদে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮০ টাকা থেকে ৬৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন।
আসনগুলো হলো, ময়মনসিংহ-৪, সিলেট-১, কুমিল্লা-৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩, ঢাকা-১৮, যশোর-৩ ও কুড়িগ্রাম-২। এই আসনগুলোর প্রার্থীরা আসন ভেদে ৬০ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮০ টাকা থেকে ৬৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
পাঁচ লাখের বেশি ভোটারের আসন
পাঁচ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে এমন ৫২টি আসনে ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ ১ হাজার ৮১০ টাকা থেকে ৫৯ লাখ ৩৩ হাজার ৪৮০ টাকা পর্যন্ত।
আসনগুলো হলো, নারায়ণগঞ্জ-৩, জামালপুর-৫, ময়মনসিংহ-২, বগুড়া-৫, কুড়িগ্রাম-১, রাজবাড়ী-২, দিনাজপুর-৬, কিশোরগঞ্জ-১, চট্টগ্রাম-৮, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা, হবিগঞ্জ-৪, চাঁদপুর-৩, কক্সবাজার-৩, মুন্সীগঞ্জ-১, ঢাকা-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, কক্সবাজার-১, জামালপুর-৩, বগুড়া-৭, কুমিল্লা-১০, সাতক্ষীরা-২, কিশোরগঞ্জ-২, পাবনা-৫, সুনামগঞ্জ-৫, গাজীপুর-৩, চাঁদপুর-৫, বরগুনা-১, সিলেট-৪, নোয়াখালী-৩, চুয়াডাঙ্গা-১, ঠাকুরগাঁও-১, ফরিদপুর-১, রংপুর-৪, মুন্সীগঞ্জ-৩, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা, সিলেট-৬, রংপুর-৩, ফেনী-৩, ঝিনাইদহ-২, গাইবান্ধা-৩, চট্টগ্রাম-১৫, পটুয়াখালী-১, নোয়াখালী-৫, নেত্রকোনা-২, সাতক্ষীরা-৩, ভোলা-৪, চট্টগ্রাম-৫, সুনামগঞ্জ-১, বরিশাল-৫, চাঁদপুর-২, কুমিল্লা-৩ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১। এসব আসনের প্রার্থীরা ৫০ লাখ এক হাজার ৮১০ টাকা থেকে আসন ভেদে ৫৯ লাখ ৩৩ হাজার ৪৮০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
চার লাখের বেশি ভোটারের আসন
চার লাখের বেশি ভোটার রয়েছে ১১৩টি আসনে। এসব আসনের প্রার্থীরা ৪০ লাখ ৫৯০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
আসনগুলো হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, সাতক্ষীরা-১, ফরিদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১১, নরসিংদী-৫, লক্ষ্মীপুর-২, চট্টগ্রাম-১০, চুয়াডাঙ্গা-২, চট্টগ্রাম-২, মৌলভীবাজার-৪, পাবনা-৩, মৌলভীবাজার-৩, সিরাজগঞ্জ-৬, নারায়ণগঞ্জ-৫, যশোর-২, ময়মনসিংহ-১, ঢাকা-৭, কুমিল্লা-৯, কুষ্টিয়া-২, দিনাজপুর-৫, নরসিংদী-১, কুমিল্লা-৫, সিরাজগঞ্জ-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, নওগাঁ-১, মানিকগঞ্জ-২, সিরাজগঞ্জ-২, ঢাকা-৯, রংপুর-৫, রাজশাহী-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, গাইবান্ধা-৪, টাঙ্গাইল-৬, হবিগঞ্জ-১, জয়পুরহাট-১, পাবনা-১, পঞ্চগড়-১, টাঙ্গাইল-৫, মানিকগঞ্জ-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, নীলফামারী-১, যশোর-৪, নেত্রকোনা-১, ঢাকা-১৪, বগুড়া-৬, নোয়াখালী-১, নীলফামারী-৪, শেরপুর-১, কিশোরগঞ্জ-৩, চট্টগ্রাম-৪, নাটোর-৪, লক্ষ্মীপুর-৩, সিরাজগঞ্জ-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪, কুষ্টিয়া-৩, নওগাঁ-৩, পাবনা-৪, শেরপুর-২, ঢাকা-১১, কুমিল্লা-১, টাঙ্গাইল-১, ফেনী-২, মাদারীপুর-২, লালমনিরহাট-২, ফরিদপুর-৩, জামালপুর-১, ঝিনাইদহ-৩, মাগুরা-১, রাজবাড়ী-১, নরসিংদী-৪, কিশোরগঞ্জ-৬, সিলেট-৫, সিরাজগঞ্জ-৫, কুষ্টিয়া-৪, রাজশাহী-৩, খুলনা-৬, বরিশাল-৪, কুমিল্লা-১১, দিনাজপুর-৪, নেত্রকোনা-৩, ঢাকা-৫, হবিগঞ্জ-৩, ঢাকা-২, গাইবান্ধা-১, টাঙ্গাইল-২, লক্ষ্মীপুর-৪, ময়মনসিংহ-৬, পঞ্চগড়-২, দিনাজপুর-১, মাগুরা-২, চট্টগ্রাম-৯, সিলেট-৩, দিনাজপুর-৩, শরীয়তপুর-২, টাঙ্গাইল-৮, শেরপুর-৩, গাইবান্ধা-২, চট্টগ্রাম-১৬, কুমিল্লা-৪, ময়মনসিংহ-১০, পিরোজপুর-২, নারায়ণগঞ্জ-১, ঢাকা-১৩, কিশোরগঞ্জ-৪, নাটোর-২, ভোলা-১, কুষ্টিয়া-১, লালমনিরহাট-১, ময়মনসিংহ-৭, খুলনা-৫, চাঁদপুর-৪, ঢাকা-১৬ ও মানিকগঞ্জ-৩। এসব আসনের প্রার্থীরা আসন ভেদে ৪০ লাখ ৫৯০ থেকে ৪৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮০ টাকা ব্যয় করতে পারবে।
তিন লাখের বেশি ভোটারের আসন
তিন লাখের বেশি ভোটার রয়েছে এমন ১০৪টি আসনে ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ লাখ ৩০ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩৯ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ টাকা।
আসনগুলো হলো, গোপালগঞ্জ-১, ভোলা-২, শরিয়তপুর-১, চট্টগ্রাম-১৩, হবিগঞ্জ-২, পিরোজপুর-১, নড়াইল-২, ঢাকা-১০, ভোলা-৩, ময়মনসিংহ-৫, কক্সবাজার-২, মাদারীপুর-৩, চট্টগ্রাম-১, বরিশাল-২, নীলফামারী-২, ফেনী-১, গাইবান্ধা-৫, সিরাজগঞ্জ-১, ময়মনসিংহ-৯, গোপালগঞ্জ-২, টাঙ্গাইল-৩, রংপুর-২, কুমিল্লা-৮, বাগেরহাট-৪, মুন্সীগঞ্জ-২, খুলনা-৪, ঢাকা-২০, বগুড়া-১, পটুয়াখালী-৩, কক্সবাজার-৪, বাগেরহাট-১, টাঙ্গাইল-৭, নেত্রকোনা-৪, রংপুর-১, কুমিল্লা-২, টাঙ্গাইল-৪, যশোর-৫, পাবনা-২, সুনামগঞ্জ-৩, নওগাঁ-২, সুনামগঞ্জ-৪, দিনাজপুর-২, রাজশাহী-২, সিলেট-২, কুড়িগ্রাম-৩, নাটোর-১, ঝালকাঠী-২, ঠাকুরগাঁও-৩, নারায়ণগঞ্জ-২, নওগাঁ-৫, কুড়িগ্রাম-৪, ঢাকা-৪, ঢাকা-৩, নোয়াখালী-২, বগুড়া-৪, ময়মনসিংহ-১১, রাজশাহী-৬, চাঁদপুর-১, রংপুর-৬, গাজীপুর-৫, কিশোরগঞ্জ-৫, রাজশাহী-৫, চট্টগ্রাম-১২, ঢাকা-১৫, জয়পুরহাট-২, ময়মনসিংহ-৮, নওগাঁ-৬, বগুড়া-২, শরিয়তপুর-৩, ঠাকুরগাঁও-২, চট্টগ্রাম-৬, নোয়াখালী-৬, বগুড়া-৩, বাগেরহাট-২, মৌলভীবাজার-১, বরগুনা-২, খুলনা-২, নওগাঁ-৪, ঢাকা-১৭, ঝিনাইদহ-৪, ঢাকা-১২, বরিশাল-৩, ফরিদপুর-২, গাজীপুর-৪, কুমিল্লা-৭, বরিশাল-১, নাটোর-৩, ঝিনাইদহ-১, মাদারীপুর-১, রাজশাহী-৪, চট্টগ্রাম-৭, মেহেরপুর-১, বরিশাল-৬, বান্দরবান পার্বত্য জেলা, পটুয়াখালী-২, চট্টগ্রাম-১৪, পটুয়াখালী-৪, যশোর-১, গোপালগঞ্জ-৩, লালমনিরহাট-৩, খুলনা-১, সুনামগঞ্জ-২, জামালপুর-৪ ও মৌলভীবাজার-২। এসব আসনের প্রার্থীরা ৩০ লাখ ৩০ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩৯ লাখ ৯৫ হাজার ১০শ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
দুই লাখের বেশি ভোটারের আসন
দুই লাখের বেশি ভোটার রয়েছে এমন ২০টি আসনে প্রার্থীরা সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৬৮০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন।
আসনগুলো হলো, ময়মনসিংহ-৩, সাতক্ষীরা-৪, নীলফামারী-৩, নড়াইল-১, ঢাকা-৬, নেত্রকোনা-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, নরসিংদী-২, নরসিংদী-৩, জামালপুর-২, লক্ষ্মীপুর-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ঢাকা-৮, মেহেরপুর-২, বাগেরহাট-৩, চট্টগ্রাম-৩, খুলনা-৩, পিরোজপুর-৩, যশোর-৬ ও ঝালকাঠী-১। এসব আসনের প্রার্থীরা ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৩১০ টাকা থেকে আসন ভেদে ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৬৮০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
সর্বনিম্ন ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা
ইসি সূত্র জানায়, ৩০০ আসনের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোটার রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসনে—২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসেবে ব্যয়সীমা দাঁড়ায় ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৩১০ টাকা। তবে আইনে সর্বনিম্ন ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্ধারিত থাকায় এই আসনসহ যেসব আসনে ভোটারপ্রতি ব্যয় ২৫ লাখ টাকার কম হয়, সেসব আসনেও প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানউল্লাহ বলেন, ‘আইন সংশোধনের মাধ্যমে ২৫ লাখ টাকা বা ভোটারপ্রতি ১০ টাকা—যেটি বেশি হবে, সেটিকেই নির্বাচনী ব্যয়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ভোটার বেশি এমন আসনে ব্যয়সীমা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।’
ব্যয়সীমা লঙ্ঘনে জেল-জরিমানা
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আরপিওর ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যয়সীমা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে বে-আইনি কর্মকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত করা হবে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
নির্বাচনের সার্বিক চিত্র
সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বর্তমানে প্রার্থিতা চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়া চলছে।
এবার ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে। দলীয়ভাবে ২ হাজার ৯১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে।